হাসান মাহমুদ:
ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়—এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক অস্তিত্বের মৌল স্তম্ভ। মানবসভ্যতার প্রারম্ভ থেকে আজ পর্যন্ত অগণিত ভাষার জন্ম হয়েছে আবার অনেক ভাষাই ইতিহাসের অতল গহ্বরে মিলিয়ে গেছে; যেগুলোর অস্তিত্ব এখন কেবল প্রাচীন পান্ডুলিপি ও প্রত্ননিদর্শনেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু ভাষার অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় জীবন বিসর্জনের নজির বিশ্ব-ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল। সেই বিরল নজির প্রতিষ্ঠা করেছে বাঙালি জাতি, যারা মাতৃভাষার স্বীকৃতি অর্জনে রক্ত দিতে পিছপা হয়নি।কোন জাতীয় প্রাণ দিয়েছে এমন নজির পৃথিবীতে বিরল। বাঙ্গালী জাতী নিজেদের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় প্রাণ উসর্গ করে ইতিহাসে অনন্য দৃষ্ঠান্ত সৃষ্টি করেছে।
বাংলা ভাষার জন্য সংগ্রামের ইতিহাস এক দীর্ঘ এবং রক্তসিক্ত পথচলার নাম। সেই পথচলার প্রতিটি ধাপে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আত্মত্যাগ করেছেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যকার কিছু নাম আমাদের ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদায় স্থান করে নিয়েছে। ভাষা শহীদ আব্দুস সালাম তাঁদেরই অন্যতম। ২০২৫ সালে তাঁর জন্মের একশ বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতি নতুনভাবে স্মরণ করছে সেই সংগ্রামী তরুণকে, যিনি মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন।
আব্দুস সালামের জন্ম ১৯২৫ সালের এই দিনেই ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলার লক্ষণপুর গ্রামে। সাধারণ পরিবারের সন্তান সালামের বেড়ে ওঠা ছিল নিভৃত গ্রামের ধূলিমাটি ও পরিশ্রমী জীবনের সঙ্গে জড়িত। তবে পরিবেশ যত সরলই হোক, তাঁর চেতনা ছিল গভীরভাবে জাগ্রত।
১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সমগ্র পূর্ববাংলা উত্তাল হয়ে ওঠে। এই আন্দোলন মূলত জন্ম নেয় শাসকগোষ্ঠীর আরোপিত বৈষম্যমূলক ভাষানীতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া থেকে। ২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার জারি করা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে হাজারো ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকার সেই ঐতিহাসিক মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন আব্দুস সালামও। পুলিশের গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং দীর্ঘ চিকিৎসার পর ৭ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর এ আত্মত্যাগ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—দেশপ্রেম কখনও বয়স, পেশা বা পরিচয়ের সীমারেখায় বন্দি থাকে না; বরং তা মানুষের বিবেক ও মানবিক বোধ থেকেই জন্ম নেয়।
জন্মশতবর্ষের উপলক্ষে তাঁর জীবন ও অবদানকে নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন প্রজন্মের কাছে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। কারণ আজকের ডিজিটাল যুগে ভাষার ব্যবহার ও পরিচয় নানাভাবে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মাতৃভাষার প্রতি উদাসীনতা, ভুল প্রয়োগ কিংবা অনুরাগহীনতা ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে সালামের মতো তরুণের আত্মোৎসর্গ আমাদের মূল্যবোধকে পুনর্বিবেচনা করতে সহায়তা করে।
আজকের তরুণ সমাজের দায়িত্ব হলো বাংলা ভাষার শুদ্ধচর্চা, মর্যাদা রক্ষা এবং ভাষা শহীদদের আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করা। মাতৃভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারক। ভাষার প্রতি অবহেলা মানে নিজেদের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া।
শহীদ আব্দুস সালামের জীবন তাই শুধু এক ব্যক্তিগত ইতিহাস নয়; এটি একটি জাতির জাগরণের গল্প। তাঁর মৃত্যু আমাদের শেখায়—স্বাধীনতার সংগ্রাম শুধু রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের বিষয় নয়; বরং তা ভাষা, সংস্কৃতি ও মানুষের আত্মমর্যাদার প্রশ্নের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। সালামের ত্যাগ তাই আমাদের অনুপ্রেরণার শিখা হয়ে আজও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আলো ছড়াচ্ছে।