একটি যুগের অবসান: ত্যাগ, সংগ্রাম ও অর্জনের নাম বেগম খালেদা জিয়া
হাসান মাহমুদ
বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে আজ নেমে এসেছে এক গভীর নীরবতা। ত্যাগ, সংগ্রাম আর ক্ষমতার টানাপোড়েনের ভেতর দিয়ে যে নারী দীর্ঘ চার দশক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন—বেগম খালেদা জিয়া—তাঁর প্রস্থান একটি যুগের ইতি টানল। ব্যক্তিগত শোককে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে রূপান্তর করা এই নেত্রীর জীবন ছিল কেবল রাজনৈতিক নয়, ছিল ইতিহাসেরই এক অধ্যায়।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসেন প্রস্তুতি নিয়ে নয়, নিয়তির ডাকে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তিনি হারান স্বামী, আর একই সঙ্গে হারান এক স্বাভাবিক ব্যক্তিগত জীবন। সেই শোকের ভেতর দাঁড়িয়েই তিনি বেছে নেন জনজীবনের কঠিন পথ—যেখানে ছিল অবিরাম সমালোচনা, সংঘাত ও অনিশ্চয়তা।
১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি ফিরিয়ে দেন সংসদীয় গণতন্ত্র। এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন—ক্ষমতার ভার রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সংসদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত। পরবর্তী সময়ে আরও দুই দফা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে উন্নয়ন, সম্ভাবনা ও বিতর্ক—সবই পাশাপাশি চলেছে।
ক্ষমতার বাইরে থেকেও তিনি ছিলেন বিরোধী রাজনীতির প্রধান কণ্ঠ। আন্দোলন, অবরোধ, নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল দৃঢ়। মামলা, কারাবাস ও দীর্ঘ অসুস্থতা তাঁকে শারীরিকভাবে দুর্বল করলেও রাজনৈতিক উপস্থিতিকে পুরোপুরি মুছে দিতে পারেনি।
শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের রাজনীতিকে দুই মেরুতে বিভক্ত করেছে—এই দ্বন্দ্ব যেমন সংঘাত সৃষ্টি করেছে, তেমনি সমসাময়িক রাজনীতির কাঠামোকেও নির্ধারণ করেছে।
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন অনিবার্য। তিনি নারী নেতৃত্বের এক শক্ত প্রতীক, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ মুখ এবং বিতর্কপূর্ণ হলেও গভীরভাবে প্রভাবশালী এক রাজনৈতিক চরিত্র। ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে ত্যাগের শক্তি, সংগ্রামের দৃঢ়তা ও অর্জনের ভার নিয়ে—বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল অধ্যায়ের নাম হিসেবে।