হাওর: প্রকৃতির ছন্দে গড়া জীবন, মানুষের দায়ে বিপন্ন ভবিষ্যৎ
(ইকবাল জিল্লুল মজিদ
পরিচালক কমিউনিটি হেলথ প্রোগ্রাম, রাডডা এমসিএইচ এফপি সেনটার)
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি কেবল মানচিত্রের রেখা নয়, এটি মানুষের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতির গভীর প্রতিফলন। এই ভূপ্রকৃতির ভেতর হাওর অঞ্চল একটি ব্যতিক্রমী বাস্তবতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাওরকে অনেক সময় মৌসুমি জলাভূমি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হলেও বাস্তবে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন্ত ব্যবস্থা, যেখানে প্রকৃতি ও মানুষ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে সহাবস্থান করে। হাওর কোনো স্থির ভূমি নয়, এটি সময় ও ঋতুর সঙ্গে নিজেকে বদলায়, আর এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই এখানে জীবনের ধারাবাহিকতা টিকে থাকে।
হাওরের প্রকৃতি বোঝার জন্য প্রথমেই এর পরিবর্তনশীল চরিত্রকে উপলব্ধি করা জরুরি। বছরের একটি দীর্ঘ সময় হাওর থাকে অথৈ পানির নিচে, আবার শুষ্ক মৌসুমে সেই একই এলাকা হয়ে ওঠে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। এই রূপান্তরের মধ্য দিয়েই হাওরে মাছের জন্ম, পাখির আশ্রয়, জলজ উদ্ভিদের বিস্তার এবং মানুষের খাদ্য উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। প্রকৃতির এই ছন্দে কোনো তাড়াহুড়া নেই, নেই অতিরিক্ত চাপ, আছে ধৈর্য ও ভারসাম্য। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন মানুষ এই ছন্দকে নিজের সুবিধামতো নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
উন্নয়ন একটি প্রয়োজনীয় বাস্তবতা, কিন্তু উন্নয়নের সংজ্ঞা যদি কেবল অবকাঠামো আর পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে প্রকৃতি সেখানে উপেক্ষিত হয়। হাওর এলাকায় পরিকল্পনাহীন বাঁধ, উঁচু সড়ক এবং ভারী নির্মাণকাজ প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। পানি যেখানে স্বাভাবিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার কথা, সেখানে তা আটকে যাচ্ছে, আবার কোথাও দ্রুত নেমে গিয়ে মাছের ডিম ও পোনা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
হাওরের মানুষের জীবন প্রকৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠেনি। তারা প্রকৃতির সঙ্গে বোঝাপড়ার মধ্য দিয়েই জীবন চালাতে শিখেছে। এখানকার কৃষক জানেন কখন জমিতে নামা নিরাপদ, কখন ধান কাটতে হবে। জেলেরা জানেন কোন মৌসুমে মাছ ধরা উচিত আর কখন হাওরকে বিশ্রাম দিতে হয়। এই জ্ঞান কোনো বইয়ে লেখা নয়, কিন্তু এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা বাস্তব অভিজ্ঞতা। উন্নয়ন পরিকল্পনায় এই স্থানীয় জ্ঞানকে গুরুত্ব না দিলে সেই পরিকল্পনা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।
জীববৈচিত্র্য হাওরের প্রাণ। দেশি মাছ, জলজ উদ্ভিদ, পাখি ও ক্ষুদ্র প্রাণী মিলেই এই ব্যবস্থাকে সচল রাখে। যখন দেশি মাছের প্রজাতি কমে যায়, তখন তা শুধু একটি প্রাকৃতিক ক্ষতি নয়, এটি দরিদ্র মানুষের পুষ্টির প্রধান উৎস নষ্ট হওয়ার সংকেত। শিশু ও নারীদের মধ্যে অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। জলজ উদ্ভিদ ধ্বংস হলে পানির স্বাভাবিক পরিশোধন ব্যবস্থা ব্যাহত হয় এবং পানিবাহিত রোগের আশঙ্কা বাড়ে।
কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর চাপ হাওর অঞ্চলে নতুন এক সংকট তৈরি করছে। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার স্বল্পমেয়াদে ফলন বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে। এই রাসায়নিক পদার্থ পানির সঙ্গে মিশে মাছ ও জলজ প্রাণীর ক্ষতি করছে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরেও প্রবেশ করছে। স্বাস্থ্যখাতে কাজ করার অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, পরিবেশগত এই পরিবর্তনের প্রভাব ধীরে ধীরে মানুষের রোগব্যাধির ধরন ও বিস্তারে প্রতিফলিত হচ্ছে।
হাওর অঞ্চলের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সাধারণ এলাকার তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বর্ষাকালে বিশুদ্ধ পানির সংকট, পানিবাহিত রোগ এবং চিকিৎসাসেবায় পৌঁছানোর সীমাবদ্ধতা মানুষের দুর্ভোগ বাড়ায়। গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। শুষ্ক মৌসুমে আবার কাজের অভাবে অনেক পরিবার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। হাওরের পরিবেশ নষ্ট হলে এই সমস্যাগুলো আরও গভীর ও জটিল হয়ে ওঠে।
পরিবেশ সংরক্ষণে আইন ও নীতিমালার অভাব নেই, কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে দুর্বলতা স্পষ্ট। অনেক সময় পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় স্থানীয় মানুষের মতামত গুরুত্ব পায় না। ক্ষতি হলে দায় নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে প্রকৃতি ও মানুষ—দুজনেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই অবস্থা চলতে থাকলে হাওর তার স্বাভাবিক সক্ষমতা হারাবে, যার প্রভাব পুরো দেশের ওপর পড়বে।
হাওর রক্ষার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য ও স্বাস্থ্য—এই সবকিছু একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। কোনো একটি খাতকে আলাদা করে দেখলে সমস্যার সমাধান হয় না। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ বজায় রাখা এবং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের মানসিকতা গড়ে তোলাই হতে পারে টেকসই সমাধানের পথ। হাওরকে তার নিজের মতো করে বাঁচতে দিতে পারলেই মানুষও নিরাপদ থাকবে।
সবশেষে বলা যায়, হাওর কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, এটি বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। হাওর ধ্বংস মানে শুধু প্রকৃতির ক্ষতি নয়, এটি মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর সরাসরি আঘাত। উন্নয়ন যদি প্রকৃতির সীমা মেনে না চলে, তাহলে সেই উন্নয়ন একদিন আমাদেরই ক্ষতির কারণ হবে। তাই হাওর রক্ষা করা মানে প্রকৃতিকে রক্ষা করা, মানুষকে রক্ষা করা এবং ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা।
সংগৃহীত - আমির হোসেন, CNR