স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও প্রান্তিকতার বেড়াজাল: বাংলাদেশের উপেক্ষিত মানুষের গভীর বাস্তবতা -
(ইকবাল জিল্লুল মজিদ)
বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে ৫৪ বছর অতিক্রম করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে অবকাঠামো, অর্থনীতি, যোগাযোগ, প্রযুক্তি ও মানব উন্নয়নের বহু সূচকে অগ্রগতি দৃশ্যমান। রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ন, মেগা প্রকল্প, রপ্তানি আয়, ডিজিটাল সেবা সব মিলিয়ে একটি “উন্নয়নশীল রাষ্ট্র”-এর চিত্র সামনে আসে। কিন্তু এই আলোকোজ্জ্বল চিত্রের আড়ালে আজও রয়ে গেছে এক বিশাল জনগোষ্ঠী, যারা উন্নয়নের ধারার বাইরে, রাষ্ট্রীয় নীতির প্রান্তে এবং সামাজিক ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে। এরা হলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যাদের জীবন বাস্তবতা স্বাধীনতার স্বপ্নের সঙ্গে আজও সাংঘর্ষিক।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বলতে শুধু দারিদ্র্যে আক্রান্ত মানুষকে বোঝানো যায় না। এরা এমন মানুষ, যাদের অর্থনৈতিক দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত থাকে সামাজিক বঞ্চনা, রাজনৈতিক অদৃশ্যতা, সাংস্কৃতিক অবমূল্যায়ন এবং রাষ্ট্রীয় সেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার। গ্রামীণ ভূমিহীন কৃষক, নদীভাঙনে সর্বস্বান্ত পরিবার, শহরের বস্তিবাসী, চা-শ্রমিক, হরিজন ও দলিত জনগোষ্ঠী, আদিবাসী সম্প্রদায়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বয়স্ক একাকী মানুষ, যৌন ও লিঙ্গ সংখ্যালঘু, স্বল্প আয়ের নারী শ্রমিক সবাই এই প্রান্তিকতার ভিন্ন ভিন্ন স্তরে অবস্থান করছে।
প্রশ্ন ওঠে স্বাধীনতার এত বছর পরও কেন এদের অবস্থার মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি? এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ইতিহাস, রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং সামাজিক মানসিকতার গভীরে যেতে হয়। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন। কিন্তু সেই পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় ন্যায়ভিত্তিক বণ্টনের দর্শন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। উন্নয়ন পরিকল্পনা হয়েছে মূলত উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে, মানুষের সামাজিক অবস্থানকে নয়। ফলে যে উন্নয়ন হয়েছে, তা হয়েছে অসম।
ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রান্তিকতার অন্যতম মূল কারণ। গ্রামীণ বাংলাদেশে ভূমি এখনো ক্ষমতার প্রধান প্রতীক। স্বাধীনতার পর ভূমি সংস্কারের কথা বলা হলেও বাস্তবে বড় ভূমির মালিকানা কাঠামো খুব একটা বদলায়নি। ভূমিহীন কৃষক আজও বর্গাচাষ, দিনমজুরি বা মৌসুমি কাজের ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীভাঙন এই সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়েছে। প্রতিবছর হাজার হাজার পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে শহরমুখী হচ্ছে, কিন্তু শহর তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নয় বরং নতুন ধরনের প্রান্তিকতা তৈরি করছে।
শহরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিত্র আরও জটিল। বস্তিবাসী মানুষেরা শহরের অর্থনীতিকে সচল রাখে নির্মাণ শ্রমিক, গৃহকর্মী, রিকশাচালক, পোশাক শ্রমিক কিন্তু তাদের বসবাসের অধিকার অনিশ্চিত, স্বাস্থ্যসেবা অপর্যাপ্ত, শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রবেশ সীমিত। নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় তারা প্রায় অদৃশ্য। উচ্ছেদ হয়, পুনর্বাসন হয় না। ফলে রাষ্ট্র তাদের শ্রম গ্রহণ করে, কিন্তু নাগরিক মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়।
শিক্ষা ব্যবস্থাও প্রান্তিকতা ভাঙতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। প্রাথমিক স্তরে ভর্তির হার বাড়লেও গুণগত মান ও ধারাবাহিকতা বড় সমস্যা। দরিদ্র পরিবারে শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক দায়িত্ব শিক্ষাকে মাঝপথে থামিয়ে দেয়। কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ সীমিত থাকায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানরা উচ্চ আয়ের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারে না। শিক্ষা তখন সামাজিক গতিশীলতার সিঁড়ি না হয়ে কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায়।
স্বাস্থ্যখাতেও একই চিত্র। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো প্রান্তিক মানুষের নাগালের বাইরে। দূরত্ব, খরচ, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলা তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। অপুষ্টি, মাতৃমৃত্যু, দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে বেশি দেখা যায়। অসুস্থতা তাদের দারিদ্র্যকে আরও গভীর করে তোলে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন।
নারী প্রান্তিকতা বাংলাদেশের একটি গভীর ও বহুমাত্রিক বাস্তবতা। দরিদ্র নারীরা একদিকে অর্থনৈতিক শোষণের শিকার, অন্যদিকে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বেড়াজালে আবদ্ধ। গৃহকর্মী, পোশাক শ্রমিক বা কৃষিশ্রমিক হিসেবে তাদের অবদান বিশাল হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের কণ্ঠ দুর্বল। নিরাপত্তাহীনতা, মজুরি বৈষম্য এবং সহিংসতা তাদের জীবনের নিত্যসঙ্গী। স্বাধীনতার রাজনৈতিক অর্জন নারীর জীবনে সমানভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
আদিবাসী ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে প্রান্তিকতা আরও কাঠামোগত। ভূমি অধিকার, ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে তারা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলার শিকার। উন্নয়ন প্রকল্প অনেক সময় তাদের উচ্ছেদ করে, কিন্তু সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ থাকে না। ফলে উন্নয়ন তাদের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং অস্তিত্ব সংকট হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক ব্যবস্থাও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে কার্যকর হয়নি। ভোটাধিকার থাকলেও প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব দুর্বল। স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে অর্থ ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠকে চাপা দেয়। নীতিনির্ধারণে তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হয় না। ফলে নীতি হয় কাগুজে, বাস্তবতা হয় ভিন্ন।
সবচেয়ে গভীর কারণটি হলো মানসিকতা। প্রান্তিক মানুষকে আমরা প্রায়ই “সহায়তার বস্তু” হিসেবে দেখি, “অধিকারের অধিকারী” হিসেবে নয়। দয়া ও দানের সংস্কৃতি আছে, কিন্তু ন্যায্যতার সংস্কৃতি দুর্বল। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো ছাড়া প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়। রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক সবাই যদি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সমান মর্যাদার মানুষ হিসেবে না দেখে, তাহলে উন্নয়ন শুধু পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
৫৪ বছরে বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এই করুণ অবস্থান কোনো একক ব্যর্থতার ফল নয়। এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত বৈষম্য, অসম উন্নয়ন দর্শন, দুর্বল সুশাসন ও সামাজিক উদাসীনতার সম্মিলিত ফল। এই বাস্তবতা স্বীকার না করলে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও ব্যর্থ হবে।
একটি সত্যিকারের উন্নত বাংলাদেশ গড়ে উঠতে পারে তখনই, যখন উন্নয়নের কেন্দ্রে থাকবে প্রান্তিক মানুষ তাদের অধিকার, কণ্ঠ ও মর্যাদা। অন্যথায় স্বাধীনতার বয়স বাড়বে, কিন্তু স্বাধীনতার স্বাদ তাদের জীবনে পৌঁছাবে না।
সংগ্রহ - আমির হোসেন