
সময় বয়ে যায় তার নিজস্ব নিয়মে, কিন্তু কিছু স্মৃতি হৃদয়ের কোণায় জলছবির মতো জমা থাকে। আমার কাছে সাহিত্য মানে কেবল শব্দের খেলা নয়, বরং এটি হলো মনের গহিন কোণের সেই অভিমান বা ভালোবাসা যা মুখে বলা যায় না। আমাদের এই মফস্বল শহর কিশোরগঞ্জের আকাশটা বড্ড মায়াবী। শরতের বিকেলে যখন ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে কাশফুলের দোলা লাগে, তখন মনে হয় জীবনটা বুঝি কোনো এক অমর কাব্য। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালে কত শত অব্যক্ত বেদনা লুকিয়ে থাকে, তা কেবল আমাদের মতো যারা কলম ধরে তারাই জানে। শৈশব থেকে দেখে আসছি আমাদের মহিনন্দ গ্রামের সেই তপ্ত মেঠোপথ, মেঘের রঙে ধরা দেয়া বর্ষার গোধূলি—সবকিছু যেন আমাকে এক বিস্ময়কর ঘোরে নিয়ে যায়। কখনো কখনো মনে হয়, আমি কি আসলেই এই পৃথিবীর যাত্রী, নাকি কোনো এক হারানো গল্পের চরিত্র?
আজকের যান্ত্রিক পৃথিবীতে মানুষ যখন কাগজ-কলম ছেড়ে স্ক্রিনে বন্দি, তখন আমার কাছে একটি কবিতা বা গদ্য যেন এক দীর্ঘ নিশ্বাস। চারপাশের প্রত্যাশার চাপ, সাফল্যের দৌড় আর না বলা অভিমানগুলো যখন পাথর হয়ে বুকে চেপে বসে, তখন শব্দই হয়ে ওঠে একমাত্র আশ্রয়। শিশুদের হাসি, নদীর কলতান আর ঘরের কোণে পুরনো বইয়ের গন্ধ আমাকে শিখিয়েছে যে—বাচালতা নয়, নীরবতাই হলো সবচেয়ে বড় ভাষা। আমার এই ক্ষুদ্র পথচলায় আমি দেখেছি, মানুষ যতটা না তার জয়গান গাইতে ভালোবাসে, তার চেয়েও বেশি ভালোবাসে নিজের ক্ষতগুলোকে আড়াল করতে।
আমি চাই আমার লেখার মধ্য দিয়ে সেই সব মানুষের কথা বলতে, যাদের গল্পের খবর কেউ রাখে না। যারা প্রতিদিন হেরে গিয়েও পরদিন আবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। আমাদের চারপাশে এমন কতশত মানুষ আছে যারা ভেতরে ভেতরে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, অথচ বাইরে এক চিলতে হাসি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আমার প্রতিটি শব্দ যেন হয় সেই সব মানুষের নীরব প্রতিবাদ, প্রতিটি বাক্য যেন হয় এক অমলিন স্মৃতির প্রতিচ্ছবি। সাহিত্যের এই পথে আমি কেবল একজন পথিক মাত্র, যার ঝোলা ভর্তি শুধু অনুভব আর আকাশ ছোঁয়া কিছু অপূর্ণ ইচ্ছে।
পরিশেষে এটুকুই বলা যায়, জীবন মানে কেবল সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছানো নয়; বরং জীবনের ছোট ছোট অপূর্ণতা আর ব্যর্থতাগুলোকে ভালোবাসতে শেখাই হলো আসল সার্থকতা। আমি হয়তো কোনো বড় সাহিত্যিক নই, কিন্তু আমার কলম যখন কথা বলে, তখন আমি নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে উঠি। স্মৃতির এই অসীম আকাশে আমি এক ক্ষুদ্র নক্ষত্র হয়েই বেঁচে থাকতে চাই।
Like this:
Like Loading...
Related