
হাসান মাহমুদঃ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অসংখ্য শহিদের আত্মত্যাগের কথা লিপিবদ্ধ থাকলেও অনেক বীরের নাম আজও আড়ালে রয়ে গেছে। তেমনি এক অবহেলিত নাম শহিদ কবি মেহেরুন্নেসা, যিনি মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হওয়া প্রথম নারী কবি হিসেবে পরিচিত।
১৯৪২ সালের ২০ আগস্ট জন্মগ্রহণ করা মেহেরুন্নেসা শৈশব থেকেই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন। পারিবারিক ও সামাজিক বাধা সত্ত্বেও স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তিনি সাহিত্যের জগতে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন। ষাটের দশকে বাংলা একাডেমির সাহিত্য আসরে তিনি ছিলেন পরিচিত মুখ। তার কবিতায় উঠে আসত শোষণ, বঞ্চনা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। যা তার লেখা পাঠে বুঝা যায়।
জনতা জেগেছে
মুক্তি শপথে দীপ্ত আমরা দুরন্ত দুর্বার,
সাত কোটি বীর জনতা জেগেছি, এই জয় বাঙলার।
পাহাড় সাগর, নদী প্রান্তরজুড়ে-
আমরা জেগেছি, নবচেতনার ন্যায্য নবাঙ্কুরে।
বাঁচবার আর বাঁচাবার দাবি দীপ্ত শপথে জ্বলি,
আমরা দিয়েছি সব ভীরুতাকে পূর্ণ জলাঞ্জলি।
কায়েমী স্বার্থবাদীর চেতনা আমরা দিয়েছি নাড়া,
জয় বাঙলার সাত কোটি বীর, মুক্তি সড়কে খাড়া।
গণতন্ত্রের দীপ্ত শপথ কণ্ঠে কণ্ঠে সাধা-
আমরা ভেঙেছি, জয় বাঙলার যত বিজয়ের বাধা।
কায়েমী স্বার্থবাদী হে মহল! কান পেতে শুধু শোনো-
সাত কোটি জয় বাঙলার বীর! ভয় করিনাকো কোনো।
বেয়নেট আর বুলেটের ঝড় ঠেলে-
চির বিজয়ের পতাকাকে দেব, সপ্ত আকাশে মেলে।
আনো দেখি আনো সাত কোটি এই দাবির মৃত্যু তুমি,
চির বিজয়ের অটল শপথ, এ জয় বাঙলা ভূমি।
১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি সক্রিয়ভাবে মিছিল-সমাবেশে অংশ নেন। ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে তিনি ঢাকার মিরপুরে নিজ বাসায় বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা উত্তোলন করেন, যা সে সময় ছিল এক বিরল সাহসিকতার দৃষ্টান্ত।
একই সময়ে বন্ধু কবি কাজী রোজীর সঙ্গে তিনি মিরপুরে বাঙালিদের সুরক্ষায় একটি ‘অ্যাকশন কমিটি’ গঠন করেন। ২৩ মার্চ ‘বেগম’ পত্রিকায় প্রকাশিত তার শেষ কবিতায় স্বাধীনতার অদম্য আহ্বান প্রতিফলিত হয়।
২৫ মার্চের গণহত্যার পর মিরপুর এলাকায় অবাঙালি বিহারী ও পাকিস্তানি বাহিনীর দখল প্রতিষ্ঠিত হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। ২৭ মার্চ কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার নেতৃত্বে সশস্ত্র দল মেহেরুন্নেসার বাসায় হামলা চালায়। এ সময় তাকে, তার দুই ভাই এবং মাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের এই সাহসী কবি শুধু কলমে নয়, জীবন দিয়েও স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তার আত্মত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
আজও যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়া এই শহিদ কবির জীবন ও সংগ্রাম নতুন প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হতে পারে। ইতিহাসের এই বিস্মৃত বীরকে স্মরণ ও সম্মান জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।