
মাসুদ রানা
বাংলা বছরের প্রথম দিন, পহেলা বৈশাখ—এই দিনটি শুধু একটি নতুন বছরের সূচনা নয়, এটি বাঙালির প্রাণের উৎসব, হৃদয়ের আনন্দ, আর গ্রামবাংলার প্রাণবন্ত মিলনমেলা। গ্রামবাংলার মানুষ সারা বছর এই দিনের জন্য অপেক্ষা করে থাকে। পুরনো দুঃখ-কষ্ট ভুলে, নতুন আশা আর স্বপ্ন নিয়ে তারা বরণ করে নেয় নতুন বছরকে।
রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ থানার পাশের ছোট্ট একটি গ্রাম। সেই গ্রামের গার্লস স্কুলটি যেন পহেলা বৈশাখ এলেই এক অন্য রূপ ধারণ করে। সারা বছর যেই স্কুলে পড়াশোনা চলে, বৈশাখের আগমনে সেই স্কুল যেন রঙের মেলায় পরিণত হয়। দেয়ালের পর দেয়াল জুড়ে আঁকা হয় বাংলার ঐতিহ্য—কৃষকের মাথায় মাঠালি, হাতে কাঁচি, সবুজ ধানের ক্ষেত, গরুর গাড়ি, নদীর নৌকা, ঢোল-করতাল, হাতি-ঘোড়ার ছবি।
স্কুলের ছোট ছোট মেয়েরা নিজেরাই রং তুলির ছোঁয়ায় সাজিয়ে তোলে তাদের প্রিয় বিদ্যালয়। কেউ আঁকে পাখি, কেউ আঁকে ফুল, কেউ আবার আঁকে গ্রামের চিরচেনা দৃশ্য। পুরো স্কুল প্রাঙ্গণ যেন জীবন্ত এক শিল্পকর্ম হয়ে ওঠে। চারপাশে রঙিন কাগজের ফুল, আলপনা আর ব্যানারে লেখা থাকে—“শুভ নববর্ষ”।
পহেলা বৈশাখের দিন সকালে সূর্য ওঠার আগেই গ্রামের মানুষ জেগে ওঠে। নতুন কাপড় পরে, বিশেষ করে সাদা লুঙ্গি, পাঞ্জাবি আর মাথায় লাল গামছা পরে পুরুষরা বের হয়। মেয়েরা পরে লাল-সাদা শাড়ি, চুলে গাঁথে ফুল। শিশুদের মুখে আনন্দের হাসি, চোখে নতুন দিনের স্বপ্ন।
গার্লস স্কুলে শুরু হয় দিনের প্রথম অনুষ্ঠান। জাতীয় সংগীত দিয়ে শুরু করে একে একে পরিবেশিত হয় নৃত্য, গান, আবৃত্তি। ছোট ছোট মেয়েরা লাল-সাদা পোশাকে নেচে ওঠে বৈশাখী গানে। “এসো হে বৈশাখ” গানের তালে তালে যেন পুরো পরিবেশ প্রাণ ফিরে পায়।
তারপর শুরু হয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, পল্লীগীতি, ভাটিয়ালি গান, ভাওয়াইয়া গান—সব মিলিয়ে এক অপূর্ব পরিবেশ সৃষ্টি হয়। কেউ অভিনয় করে যাত্রাপালা, কেউ করে কৌতুক। “যেমন খুশি তেমন সাজো” প্রতিযোগিতায় ছোট ছোট শিশুরা নানা রকম সাজে হাজির হয়—কেউ কৃষক, কেউ বউ, কেউ বাঘ, কেউ আবার ডাক্তার বা শিক্ষক সেজে সবাইকে হাসায়।
স্কুলের এই অনুষ্ঠান দেখতে আশেপাশের গ্রাম থেকে শত শত মানুষ ভিড় জমায়। শুধু এই গ্রাম নয়, পাশের গ্রাম থেকেও ছুটে আসে মানুষ। যেন এক বিশাল মিলনমেলা বসে যায়।
স্কুলের পাশেই গোয়ালন্দ বাজার এলাকায় বসে বিশাল বৈশাখী মেলা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই মেলা জমজমাট থাকে। মেলায় ঢুকলেই চোখে পড়ে নানা রঙের দোকান। কোথাও আচার বিক্রি হচ্ছে, কোথাও ফুচকা আর চটপটি, আবার কোথাও হালিম আর আলু চপের সুগন্ধে মন ভরে যায়।
মিষ্টির দোকানে সাজানো থাকে রসগোল্লা, জিলাপি, বাতাসা। শিশুদের জন্য থাকে বেলুন, খেলনা, ঘোড়া আর নানা রঙের পুতুল। হাতের কাজের গয়না, ফুলের মালা, কসমেটিকস—সব কিছুই পাওয়া যায় এই মেলায়।
মেলার একটি বিশেষ আকর্ষণ হলো মাটির তৈরি জিনিসপত্র। হাড়ি, পাতিল, কলস, হাঁস-মুরগি, বাঘ, হরিণ, চিতা—সবই তৈরি হয় মৃৎশিল্পীদের দক্ষ হাতে। তাদের হাতের ছোঁয়ায় সাধারণ মাটি হয়ে ওঠে শিল্পকর্ম। গ্রামের মানুষ এই জিনিসগুলো কিনে নিয়ে যায় ঘরের সাজ হিসেবে বা ব্যবহার করার জন্য।
মেলায় ঘুরতে ঘুরতে কোথাও দেখা যায় পান্তা-ইলিশের আয়োজন। সঙ্গে কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, লবণ—এই খাবার যেন বাঙালির ঐতিহ্যের প্রতীক। সবাই মিলে বসে খাওয়া, হাসি-আড্ডা—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম আনন্দ।
শিশুদের আনন্দ যেন সবচেয়ে বেশি। তারা কখনো বেলুন কিনছে, কখনো ঘুড়ি উড়াচ্ছে, আবার কখনো নাগরদোলায় চড়ে আকাশ ছুঁতে চাইছে। তাদের হাসি আর উল্লাসে পুরো মেলা মুখরিত হয়ে ওঠে।
এই দিনে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। ধনী-গরিব, ছোট-বড়, সবাই একসাথে মিশে যায়। সবাই যেন এক পরিবারের সদস্য হয়ে ওঠে। এই মিলনই পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
গ্রামবাংলার এই পহেলা বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের শিকড়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এখানে আছে মানুষের ভালোবাসা, আন্তরিকতা আর একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা।
দিনের শেষে যখন সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ে, তখনও মেলার আনন্দ থামে না। সন্ধ্যার আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। গান-বাজনা, হাসি-আড্ডা চলতেই থাকে। ধীরে ধীরে মানুষ বাড়ির পথে ফিরে যায়, কিন্তু তাদের মনে থেকে যায় সারাদিনের সেই আনন্দময় স্মৃতি।
পহেলা বৈশাখ মানেই নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া। পুরনো সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে নতুন করে শুরু করার প্রতিজ্ঞা। আর গ্রামবাংলায় এই দিনটি মানেই এক বিশাল মিলনমেলা, যেখানে মানুষ খুঁজে পায় আনন্দ, ভালোবাসা আর একতার বন্ধন।
এইভাবেই প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ আসে, আর গ্রামবাংলার মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে দেয়। এই উৎসব আমাদের শেখায়—আমরা সবাই এক, আমরা সবাই বাঙালি, আর আমাদের আনন্দও এক।
পহেলা বৈশাখ মানেই গ্রামবাংলার প্রাণ, পহেলা বৈশাখ মানেই হৃদয়ের উৎসব, পহেলা বৈশাখ মানেই এক অনন্য মিলনমেলা।
Like this:
Like Loading...
Related