1. dailyrodrodipto@gmail.com : রৌদ্রদীপ্ত : রৌদ্রদীপ্ত
  2. info@www.newsbddailyrodrodipto.online : রৌদ্রদীপ্ত :
বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:২৯ পূর্বাহ্ন

ইশতেহারের টাকার উৎস: “আমরা জনগণ”)/ইকবাল জিল্লুল মজিদ জবাবদিহি করবে?

  • প্রকাশিত: শনিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬
  • ২৪ বার পড়া হয়েছে

ইশতেহারের টাকার উৎস: “আমরা জনগণ” কাকে জবাবদিহি করবে?

ইকবাল জিল্লুল মজিদ
(পরিচালক, কমিউনিটি হেলথ প্রোগ্রাম, রাডডা এমসিএইচ এফপি সেনটার)

নির্বাচনী ইশতেহার শুনতে মধুর—“চাকরি হবে”, “দাম কমবে”, “হাসপাতাল হবে”, “ভাতা বাড়বে”, “শিক্ষা ফ্রি হবে”—কথাগুলো আশার। কিন্তু রাষ্ট্র চালানোর প্রশ্নটা কল্পনার নয়, অঙ্কের। জনগণ আজ আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনে তালি দিতে চায় না; জনগণ জানতে চায়—এই প্রতিশ্রুতির টাকার উৎস কোথায়? পরিকল্পনা কোথায়? কে দেবে? কীভাবে আসবে? আর কার পকেট থেকে যাবে?
ইশতেহার যদি হয় ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচালনার চুক্তি, তাহলে তার প্রথম শর্ত হওয়া উচিত—অর্থায়নের রূপরেখা (Financing Plan) ও জবাবদিহির কাঠামো (Accountability Framework)। এগুলো না থাকলে ইশতেহার “স্বপ্নের তালিকা” হয়ে থাকে; বাস্তবতায় সেটা শেষ পর্যন্ত হয় “ঋণের বোঝা, করের চাপ, কিংবা মূল্যস্ফীতির আগুন।”
১) টাকার কথা না বললে প্রতিশ্রুতি কীভাবে সত্য হবে?
রাষ্ট্রের কোনো কাজই “ফ্রি” নয়। ফ্রি শিক্ষা বললে তার টাকা আসবে হয়—
কর থেকে,
ঋণ থেকে,
উন্নয়ন সহযোগিতা/অনুদান থেকে,
রাষ্ট্রীয় সম্পদ/প্রাকৃতিক সম্পদ/ডিভিডেন্ড থেকে,
অথবা টাকা ছাপিয়ে—যা শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি বাড়ায়।
ইশতেহারে যদি এই “পাঁচ উৎস” নিয়ে স্পষ্টতা না থাকে, তবে প্রতিশ্রুতির সত্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। কারণ বাস্তবে সরকার টাকা আনে জনগণ থেকেই—সরাসরি কর দিয়ে, কিংবা পরোক্ষ কর ও বাজারদাম দিয়ে। তাই “আমরা জনগণ” জানার অধিকার রাখে—এই প্রতিশ্রুতির বিল কে দেবে?
২) “কে টাকা দিবে?”—সত্য উত্তর: আমরা সবাই, কিন্তু সবার ওপর সমান নয়
বাংলাদেশের বাস্তবতায় রাষ্ট্রের বড় আয়ের উৎস পরোক্ষ কর—ভ্যাট, শুল্ক, নানা ফি—যার চাপ পড়ে বেশি করে সাধারণ ভোক্তার ওপর। ধনী-গরিব সবাই বাজারে একই দামে ভ্যাট দেয়; কিন্তু আয়ের তুলনায় গরিবের ওপর চাপ বেশি হয়।
ফলে টাকার উৎসের কথা না বললে আশঙ্কা থাকে—ইশতেহারের বোঝা শেষ পর্যন্ত প্রান্তিক মানুষই বহন করবে—দাম বেড়ে, ফি বেড়ে, সেবা সংকুচিত হয়ে।
তাই ইশতেহারের প্রথম পরীক্ষা হওয়া উচিত:
করনীতি কি ন্যায্য হবে?
ধনীদের কাছ থেকে ন্যায্য কর আদায় হবে কি?
কালো টাকা/কর ফাঁকি/পাচার রোধ হবে কি?
অপচয় ও দুর্নীতি কমবে কি?
৩) “পরিকল্পনা নাই”—এটাই সবচেয়ে বড় সংকট
ইশতেহারে পরিকল্পনা না থাকলে তিনটা ঝুঁকি তৈরি হয়:
ক) খরচ বাড়ে, কিন্তু আয় বাড়ে না → বাজেট ঘাটতি
ঘাটতি পূরণ হয় সাধারণত ঋণ দিয়ে। ঋণ মানে সুদ, সুদ মানে ভবিষ্যৎ বাজেটে উন্নয়ন খাতের টাকা কমে যাওয়া। শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা—অর্থাৎ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
খ) বাজার থেকে টাকা তুলতে গেলে → মূল্যস্ফীতি/দাম বাড়ে
রাষ্ট্র যদি অতিরিক্ত খরচ করে, আর তার অর্থায়ন শৃঙ্খলাহীন হয়, তাহলে দাম বাড়ে, জীবনযাত্রা কষ্টকর হয়। প্রান্তিক মানুষের “দুর্ভোগ বাজেট” তখন বাস্তবে সবচেয়ে বড় বাজেট হয়ে দাঁড়ায়।
গ) প্রকল্প হয়, কিন্তু লক্ষ্য ঠিক থাকে না → অসমতা বাড়ে
বড় বড় অবকাঠামো হলে ছবি সুন্দর হয়; কিন্তু মা ও শিশুর অপুষ্টি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা—এসব নীরবে অবহেলিত থাকে।
৪) টাকার উৎসের বাস্তব কাঠামো—ইশতেহারে কী থাকা উচিত?
একটি আধুনিক ইশতেহারে অন্তত এই চারটি “অর্থনৈতিক অঙ্গীকার” থাকা জরুরি:
(১) রাজস্ব বাড়ানোর ন্যায্য পথ
কর ফাঁকি কমাতে ডিজিটাল ট্র্যাকিং
উচ্চ আয়ের মানুষের ন্যায্য আয়কর
বড় সম্পদ/অপ্রদর্শিত সম্পদ শনাক্তকরণ
অনুৎপাদনশীল সুবিধা-ছাড় (tax expenditure) কমানো
(২) অপচয়-দুর্নীতি কমিয়ে “লিকেজ” বন্ধ
ইশতেহারে শুধু “দুর্নীতি করবো না” বললে হবে না; বলতে হবে—
কোন খাতে লিকেজ বেশি
কীভাবে প্রোকিউরমেন্ট/টেন্ডার/সরকারি ক্রয় স্বচ্ছ হবে
প্রকল্প অনুমোদনে কী ধরনের খরচ-সুবিধা বিশ্লেষণ বাধ্যতামূলক হবে
(৩) ভর্তুকি ও প্রণোদনা—কার জন্য?
ভর্তুকি যদি ধনী-সুবিধাভোগীর পকেটে যায়, প্রান্তিক মানুষ কিছু পায় না।
ইশতেহারে থাকা দরকার—
ভর্তুকি হবে টার্গেটেড (যাদের দরকার তাদের জন্য)
নগদ সহায়তা/সামাজিক সুরক্ষা হবে স্বচ্ছ তালিকাভিত্তিক
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ডাটাবেস/জরিপ-ভিত্তিক নির্বাচন
(৪) ঋণ নিলে—কোথায়, কী শর্তে, কী রিটার্নে?
ঋণ খারাপ নয়; খারাপ হলো রিটার্ন ছাড়া ঋণ।
ইশতেহারে বলতে হবে—
ঋণ যাবে উৎপাদনশীল খাতে (কর্মসংস্থান, রপ্তানি, কৃষি-ভ্যালু চেইন, স্বাস্থ্য-মানবসম্পদ)
ঋণের সুদ ও পরিশোধ পরিকল্পনা কী
বৈদেশিক ঋণ ঝুঁকি (exchange rate risk) কীভাবে কমানো হবে
৫) প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রশ্ন: “আমাদের জন্য কী করবেন?”
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ইশতেহার “কাগজের অঙ্গীকার” হলে চলবে না—এটা হওয়া উচিত বাজেটের গ্যারান্টি। অন্তত পাঁচটা জায়গায় স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দরকার:
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ: ইউনিয়ন/ওয়ার্ড পর্যায়ে ওষুধ, জনবল, রেফারাল, মাতৃসেবা—এসবের বাজেট রিং-ফেন্সিং (অন্যখাতে কাটছাঁট করা যাবে না)।
মা ও শিশু পুষ্টি: অপুষ্টি কমাতে কমিউনিটি-ভিত্তিক পুষ্টি সহায়তা, কিশোরী স্বাস্থ্য, গর্ভবতী মায়ের সেবা।
কর্মসংস্থান ও দক্ষতা: শুধু “চাকরি হবে” নয়—কোন সেক্টরে, কত প্রশিক্ষণ, বাজার-চাহিদা অনুযায়ী কী স্কিল, কীভাবে প্লেসমেন্ট হবে।
শিক্ষা ব্যয় কমানো: ফ্রি বললেই হবে না—ফি, বই, কোচিং-নির্ভরতা, ডিজিটাল বিভাজন—এসব মোকাবিলায় বাস্তব পদক্ষেপ।
সামাজিক সুরক্ষা: বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী, অতিদরিদ্র—ভাতা বাড়ানোর পাশাপাশি তালিকা স্বচ্ছতা, মোবাইল মানি ট্রান্সফার, অভিযোগ-নিষ্পত্তি ব্যবস্থা।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যূনতম শর্ত:
ইশতেহারে লিখতে হবে—“এ খাতে মোট বাজেটের কত শতাংশ নিশ্চিত করা হবে।” শতাংশ ছাড়া প্রতিশ্রুতি দুর্বল।
৬) “আমরা জনগণ” কী প্রশ্ন করবে—একটি চেকলিস্ট
ভোট দেওয়ার আগে জনগণকে অন্তত এই ১০টি প্রশ্ন করতে হবে:
প্রতিশ্রুতির মোট খরচ কত?
নতুন রাজস্ব আসবে কোথা থেকে?
করের চাপ কার ওপর পড়বে?
ভ্যাট-শুল্ক কমবে নাকি বাড়বে?
ঋণ কত নেওয়া হবে, কোন শর্তে?
অপচয়/দুর্নীতি কমানোর মেকানিজম কী?
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বাজেট কত শতাংশ নিশ্চিত?
প্রকল্প বাছাই হবে কী মানদণ্ডে?
বাস্তবায়নের টাইমলাইন কী? (১ বছর/৩ বছর/৫ বছর)
অগ্রগতি মাপা হবে কীভাবে? (KPI/জনসম্মুখে রিপোর্ট)
উপসংহার: পরিকল্পনাহীন ইশতেহার—আশার নয়, ঝুঁকির বার্তা
আমরা উন্নয়ন চাই, অবশ্যই। কিন্তু উন্নয়ন মানে শুধু ঘোষণা নয়; উন্নয়ন মানে অর্থায়ন, অগ্রাধিকার, বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি।
আজকের নাগরিক সমাজের দরকার “মিষ্টি প্রতিশ্রুতি” নয়—দরকার পরিকল্পনার টেবিল: কোথায় কত খরচ, কোথা থেকে টাকা, কে দায় নেবে, আর প্রান্তিক মানুষ কীভাবে সুবিধা পাবে।
রাষ্ট্রের অর্থনীতি হলো নৈতিকতারও পরীক্ষা। কারণ বাজেট শুধু অঙ্ক নয়—এটা মানুষের জীবন। তাই ইশতেহারে যদি টাকার উৎস না থাকে, পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে সেটি জনগণের সামনে প্রকৃত অর্থে অসম্পূর্ণ চুক্তি।
আমরা জনগণ সেই অসম্পূর্ণ চুক্তিতে সই করতে পারি না—আমাদের চাই পূর্ণ হিসাব, পূর্ণ জবাবদিহি, এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকারকে কেন্দ্র করে বাস্তব।

সংগৃহ – আমির হোসেন

 

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট