
বাংলাদেশ! গণ আকাঙ্ক্ষার ব্যর্থ উত্তরাধিকার ও অলিগারকির দখলে ধ্বংসমান গণতন্ত্র:
(ইকবাল জিল্লুল মজিদ, পরিচালক কমিউনিটি হেলথ প্রোগ্রাম, রাডডা এমসিএইচ এফপি সেনটার) –
বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে ছিলো সংগ্রাম, স্বপ্ন এবং প্রতিশ্রুতি—ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা, ১১ দফা, মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এইসব গণআন্দোলনের পর আদৌ কি জনগণের চাওয়া পূরণ হয়েছে, নাকি প্রতিবারই গুটি চালিয়ে ক্ষমতায় এসেছে নতুন এক অভিজাত-দুর্বৃত্ত গোষ্ঠী? আজ আমাদের সমাজে চলছে অলিগারকি দখলদারিত্ব, যেখানে পুঁজিশক্তি, রাজনীতির মাস্তানতন্ত্র ও প্রশাসনিক দমনপীড়নের চক্রে আটকে গেছে গণতন্ত্র। নিচে সেই ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হলো।
১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট ও ২১ দফা – যেখান থেকে শুরু হয়েছিল গণদাবির ভাষা। যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা ছিল বাংলার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখা। কৃষকের ঋণমুক্তি, শিক্ষা সংস্কার, শ্রমিক অধিকার—সবই ছিল জনগণের জন্য সাহসী ঘোষণা।কিন্তু ফলাফল? ফলাফল, পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় সরকার মাত্র কয়েক মাসেই সরকার ভেঙে দেয়। জনগণের আকাঙ্ক্ষা প্রথমবারের মতো দলিত হয় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে।
১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন – এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার প্রগতিশীল সংস্কার দাবি ওঠে। সামরিক সরকার ‘শরীফ কমিশন’ নামক প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষা নীতির বিরুদ্ধে তীব্র ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে।ফলাফল?হ্যাঁ, আন্দোলনের জোরে সেই কমিশন বাতিল হয়।কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক অসংগতি,বিভাজন, বৈষম্য, বাজারীকরণ আজও বহাল। শিক্ষা আজও ক্ষমতাবানদের হাতের পণ্য।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ও ১১ দফা – ১৯৬৯ সালে ছাত্রদের ১১ দফা ছিল মৌলিক অধিকার, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও স্বাধিকার চেতনার রূপরেখা। সেই অভ্যুত্থান স্বৈরাচার আইয়ুব খানকে পতনের মুখে ঠেলে দেয়।ফলাফল?এর কিছুদিন পর আসে ১৯৭১-এর স্বাধীনতা।কিন্তু কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ জনগণের জন্য যে গণমুখী রাষ্ট্র কাঠামো কল্পনা করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের আগেই ক্ষমতা দখল করেন সামরিক, بيرোক্রেটিক ও রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণি।
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান – এর মাধ্যমে পতন ঘটে এরশাদ সরকারের। ফের গণতন্ত্র ফিরে আসে লোকতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের রীতি চালু হয়।কিন্তু গণতন্ত্র কী শুধু নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ? উত্তর—না।৯০ পরবর্তী শাসন কেবল দলীয়করণ, প্রশাসনিক দুর্নীতি, এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় রূপ নেয়। ফলে গণতন্ত্র রূপ নেয় দলতন্ত্রে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ও ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন – ২০২৪ সালে দেশে গণতন্ত্রের দমবন্ধ অবস্থা বিরাজ করছিল।বাকস্বাধীনতা হুমকির মুখে,বিরোধীদল দমনপীড়নের শিকার,রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ,ভুয়া মামলা, গুম-খুন-হামলা ছিল নৈমিত্তিক ব্যাপার।এই পরিস্থিতির প্রতিবাদে দেশের নানা স্তরের মানুষ, বিশেষত ছাত্র-যুব সমাজ বিক্ষোভে নামে। দীর্ঘ আন্দোলন ও প্রতিবাদের পর ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে।কিন্তু এরপর? এরপর প্রতিশ্রুত নতুন ভোর আজও দেখা যায়নি।নতুন সরকার এলেও,প্রশাসনে থেকে গেলো পুরনো আমলের দখলদার গোষ্ঠী,রাজনীতিতে রয়ে গেল দুর্বৃত্তায়ন,পুঁজির দখলেই থেকে গেল মিডিয়া, নির্বাচন ও বিচার ব্যবস্থা।কেনো বারবার ব্যর্থ হয় এই সমাজ?
১. পুনরুত্থিত অভিজাত শ্রেণি (Resurgent Elites):
প্রতিটি গণঅভ্যুত্থানের পরেই পুরনো শোষকদের জায়গা নেয় নতুন এক অভিজাত শ্রেণি—যারা মুখে জনগণের কথা বললেও, কার্যত শোষণ অব্যাহত রাখে।
২. প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা:
একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের জন্য দরকার স্বচ্ছ বিচার ব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা—যেগুলো প্রতিবারই উপেক্ষিত থেকেছে।
৩. সাংস্কৃতিক দখলদারিত্ব:
বাজার ও রাজনীতির যোগসাজশে মিডিয়া, শিক্ষা, সাহিত্য পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই নতুন প্রজন্ম বিরোধিতা নয়, নিষ্ক্রিয়তা শেখে।
৪. অলিগারকির দাপট:
আজ রাজনীতির কৌশলে প্রধান ভূমিকা রাখে গোষ্ঠী বিশেষ যাদের হাতে আছে টাকা, অস্ত্র, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং মিডিয়া।এগুলো মিলেই তৈরি হয়েছে এক নতুন ফ্যাসিস্ট কাঠামো যা গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে চলে।
পথ খোঁজার সময়: প্রতিটি আন্দোলনের ব্যর্থতার পরও মানুষ চুপ থাকেনি—আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তাই হতাশার মধ্যেও আশার আলো আছে। কিন্তু সেই আলোকে সত্যিকারের আলো বানাতে দরকার।নতুন নেতৃত্ব, যাদের মধ্যে থাকবে নৈতিক সাহস।শিক্ষা ব্যবস্থায় সমালোচনামূলক চেতনার বিকাশ।নাগরিক সমাজের জাগরণ ও সংগঠন।অলিগারকির বিরুদ্ধেই মূল লড়াই, কেবল সরকারের নয়।
সিদ্ধান্তবোধক আহ্বান: আমাদের ইতিহাস হলো বারবার শোষিত হওয়ার এবং বারবার প্রতিরোধ গড়ার ইতিহাস। কিন্তু এই চক্র থেকে বেরোতে হলে চাই চেতনার বিপ্লব।শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্র কাঠামোর গণতান্ত্রিক রূপান্তরই আমাদের একমাত্র মুক্তির পথ।আজ প্রয়োজন ভয়হীন কলম, প্রতিবাদী কণ্ঠ, সংগঠিত সাহস।না হলে প্রতিটি গণঅভ্যুত্থানই হয়ে যাবে ইতিহাসের পাদটীকায় হারিয়ে যাওয়া আরেকটি “ব্যর্থ স্বপ্ন”।
সংগৃহীত –